গণিত ছাত্রছাত্রীদের নিকট আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে কেনো?(বিশ্লেষণ মূলক পোস্ট)

আমাদের বাংলাদেশে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীদের নিকট গণিত একটি ভীতিকর বিষয়ের নাম। কিন্তু এই মহাবিশ্ব তে যা কিছু আছে তার সব কিছুর মাঝেই গণিত রয়েছে।


গণিত এর মাপ যোগেই চলছে এই বিশ্ব। তবুও কেন ছাত্র ছাত্রীরা এই গণিত এর নাম শুনলে ভীতো হয়ে পড়ছে ?

আজকে আমরা এর পিছনে বেশ কিছু কারণ এবং সেগুলো সমাধান খুঁজে বের করবো।


চলুন শুরু করি।


১. স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের ব্যবসায়িক মনোভাব।


আমার কাছে প্রথম যেই বিষয়টি মনে হয় যে কিছু হাত গোণা স্কুল কলেজের শিক্ষক দের ব্যবসায়িক মনোভাব গণিত কে কঠিন করে তোলার পেছনে দায়ী।

এই ধরনের শিক্ষকরা গণিতের উদ্দেশ্য গণিতে প্রয়োগ ক্ষেত্র এগুলো নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে খোলাখুলি আলোচনা তো করেই না , বরং ছাত্রছাত্রীরা যদি কোনো প্রশ্ন করে তাহলে তাদের সাথে এমন আচরণ করা হয় যাতে তারা পরবর্তীতে আর কোনো প্রশ্ন করতে উৎসাহীত হয়না।

এটাই গণিত ভীতির পেছনে আমাদের দেশে মূল কারণ।

সমাধানঃ


শিক্ষকরা যদি একটু আন্তরিক হয়ে নিজ থেকে ছাত্রদের ক্লাসে বুঝিয়ে দিতো যে গণিত আসলে একটি বিষয় নয় বরং এর সাথে জড়িত রয়েছে মহাজাগতিক নিয়ম কানুন এর অনেক কিছু।

আর এই গণিত এর উপর ভিত্তি করেই কিভাবে বিশ্ব পরিচালিত হচ্ছে প্রতিদিন এসব বিষয় নিয়ে ছাত্রদের মজার মজার তথ্য উপস্থাপন করত তাহলে গণিত ছাত্রদের কাছে কোনো ভীতিকর বিষয় হতো না।


কিন্তু এটাই বাস্তব যে আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষক কেবল মাত্র হাতে গোনা কিছু অংক ব্লাকবোর্ডে তুলে দিয়ে রেখে দেন। ভালো করে সেগুলো বুঝিয়ে দেবার ও প্রয়োজন মনে করেন না।


আমি সকল শিক্ষক কে উদ্দেশ্য করে আমার কথা বলছিনা। আমি জানি এই বাংলাদেশেই অনেক শিক্ষক রয়েছে যারা যত্ন সহকারে ছেলেমেয়েদের অংক শেখান।

তবুও কিছু পরিমান ব্যবসায়িক মনোভাবের শিক্ষকদের কারণে তাদের সুখ্যাতি ঢাকা পড়ে যায়।


২. গণিত কি? আর এর প্রয়োগ কোথায় হয়? এসব প্রশ্নের উত্তর অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীর নিকট অজনা।


আমরা ছেলেমেয়েদের গণিত শেখাটাকে কেবল মাত্র কিছু উদাহরণ আর অনুশীলনী প্র্যাকটিস করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখি।


অথচ আমরা যদি ছেলে মেয়েদের বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হতাম, যে কেবল অনুশীলনীর অংকের ভিতরই গণিত আছে তাই নয় বরং সংগীত,বাদ্যযন্ত্র, পরিবেশ, মহাবিশ্ব থেকে শুরু করে সব কিছুর মাঝেই গণিত এর বিষয়টি বিরাজমান আছে।

তাহলে হয়তো ছেলেমেয়েরা খুব সহজেই গণিত কে একটি মজার বিষয় হিসেবে গ্রহণ করতে পারতো। গণিতের উপর ভর করেই পুরো বিশ্ব ঘুরছে, জোয়ার-ভাটা হচ্ছে, সূর্য উঠছে-ডুবছে, দিন-রাত্রি-বছর হচ্ছে।

এর সব কিছুর ভেতরেই অপরূপ সুন্দর এর মত গণিত কাজ করছে। এটা ছেলে মেয়েদের বুঝিয়ে দিতে পারলে ওরা নিজ থেকেই গণিত কে ভালোবাসতে শিখবে।


৩. আমাদের পাঠ্য বই গুলোতেও কিছুটা পরিবর্তন প্রয়োজন রয়েছে।


দেশের ১ম-১০ম শ্রেণীর বই গুলোতে গণিতের প্রায় সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো সংযোজিত করা হয়েছে। এটা খুবই সময়োপযোগী ।

তবে বোর্ড বইতেও কিছু কিছু গণিত টপিক এর আলোচনা আরো সহজ ভাবে উপস্থাপনা করা যেতে পারতো । যাতে ছেলেমেয়েরা নিজে নিজে পড়েই এর কারণ উদ্দেশ্য এবং প্রয়োগক্ষেত্র সহজেই অনুধাবন করতে পারে।

আর আমাদের দেশের অনেক শিক্ষক আছে যারা টেক্সট বই ধরে ধরে ছাত্রদের না বুঝিয়ে নিজের বানানো নোট পড়ায়। যা মোটেও খুব বেশি কার্যকর হয়না।


আর ইদানিং কিছু কিছু শিক্ষক দেখা যায় যারা বছরে একটা দিনও বোর্ড বই শেখায় না।

বরং তারা সরাসরি সৃজনশীল প্রশ্নে হাত দেয়। তাদের যুক্তি হচ্ছে বোর্ড বই থেকে সরাসরি কোনো প্রশ্ন কমন পড়বে না তাই বোর্ড বই পড়িয়ে লাভ নেই।


আশ্চর্যজনক একটি বিষয়। পরীক্ষায় প্রশ্ন কমন পাওয়াটাই যেনো সব। শেখাটা কোনো বিষয় নয়!!


৪. শেখার জন্য না শিখে বরং পাশ করার জন্য শেখা হয়।


পাশ করা বা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করাটা পরের বিষয় । আসল বিষয় হচ্ছে শেখাটা ।

এটা যতদিন না আমাদের দেশের অভিভাবক বা শিক্ষকরা অনুধাবন করতে না পারবে ততদিন অংক ভীতি বা অন্য কঠিন বিষয় এর উপর ভীতি থেকেই যাবে।


পরীক্ষা নেবার উদ্দেশ্যটাই হলো ছাত্রছাত্রীরা কতটুকু শিখেছে তা যাচাই করা। শেখার কাজটা যেনো সফল হয় এজন্যই পরীক্ষা সিস্টেম।

অথচ আমাদের দেশের একটা ট্রেডিশন হয়ে গিয়েছে যে কেবল পাশ করার জন্যই পড়তে হবে। আর এই কারণেই শেখার বা শেখানোর প্রতি আগ্রহ অধিকাংশেরেই কম দেখা যায়।


৫. পাঠ্য বইয়ের বাহিরে গণিতের আর কোনো মৌলিক বই না পড়া।


শহরের অভিভাবকরা এখন মোটামোটি সচেতন ।

তারা তাদের ছেলেমেয়েদের এখন কেবল পাঠ্য বই পড়তেই উৎসাহিত করেনা বরং মৌলিক গণিতের বইও তাদের ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেয়।


অপরদিকে গ্রামে এখনও এরকম রীতি প্রচলিত হয়নি যেখানে ছাত্রছাত্রীরা গণিতের মৌলিক কিছু বই পড়তে সুযোগ পাচ্ছে।

আর এটাও গণিত এর উপর ভিতী দূর না হবার পেছনে একটা কারণ। আমি নিচে কিছু বই এর নাম উল্লেখ করছি যেগুলো পড়ার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার মনে গণিত নিয়ে উকি দেয় অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পারে।


  • অঙ্ক ভাইয়া (লেখক চমক হাসান)
  • গণিতের রঙ্গে হাসি খুশি গণিত (লেখক চমক হাসান)
  • গণিতের মজা মজার গণিত (লেখক স্যার মুহম্মদ জাফর ইকবাল)
  • গণিত এবং আরো গণিত (মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও জাকারিয়া স্বপন )


এছাড়াও জ্যামিতি নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় বই যা একজন ছাত্রের জন্য খুবই মজার হতে পারে তার তালিকা নিচে দেয়া হলো


  • জ্যামিতির যত কৌশল (অনুপম পাল ও দিপু সরকার)
  • জ্যামিতির আরো যত কৌশল (দিপু সরকার ও অনুপম পাল)
  • বুঝে করি জ্যামিতি( ডাঃ নিত্য রঞ্জন পাল ও অনিরুদ্ধ প্রামাণিক)
  • জ্যামিতির সব বিখ্যাত সমস্যা ও সমাধান(বেঞ্জামিন বোল্ড)

উপরের বই গুলো বাংলাদেশের যে কোনো ছাত্রছাত্রীর জন্য গণিত সম্পর্কে জানতে খুবই সহায়ক হতে পারে ।

তাই আমি প্রত্যাশা করবো অভিভবকরা তদের সন্তানদের জন্য এই বইগুলো সংগ্রহ করে পড়তে উৎসাহিত করবে।


৬. পর্যাপ্ত চর্চার অভাব গণিত ভীতির অন্যতম কারণ।


একটা উক্তি আমি বলতে চাই …

“চর্চা করো দশ বার নয়, একশো বারোও নয়, একহাজার বার।”


অংকের ক্ষেত্রে এই বিষয় টি খুবই জরুরি ।

আমাদের দেশে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী এই বিষয়টি এড়িয়ে যায় । ফলে তাদের ভিতরে অংক নিয়ে একটি ভয় সব সময় কাজ করে ।

যদিও এখন এই বিষয়টি একটু পরিবর্তন হচ্ছে দিন দিন। এটি একটি সুখবর।
হাজার বার চর্চা না করলে কোনো বিষয় অভ্যাসে পরিবর্তিত হয়ন।

তাই হাজার হাজার বার চর্চা করতে হবে । এটাই সফল হবার সেরা উপায়।

গণিত ছাত্রছাত্রীদের নিকট আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে কেনো?(বিশ্লেষণ মূলক পোস্ট)
গণিত ছাত্রছাত্রীদের নিকট আতঙ্কের বিষয় হচ্ছে কেনো

frlmamun

আমি এফ. আর. আল-মামুন । আমারহাট ডট কম ওয়েবসাইটের প্রতিষ্ঠাতা । আমি সৃষ্টিশীল কাজ করতে পছন্দ করি এবং যারা সৃষ্টিশীল কাজ করে তাদেরকে ভালোবাসি । আপনিও যদি সৃষ্টিশীল কিছু করতে চান তাহলে আপনিও আমারহাটে আমন্ত্রিত!!! ধন্যবাদ।

Leave a Reply